বাংলাকে ভাগ হতে দেব না, বাবাকে ফোনে জানিয়ে ছিল শহিদ অমিতাভের




ওয়েব ডেস্কঃ “বাংলার মাটি আমি বেহাত হতে দেব না। যতক্ষণ না অপারেশন শেষ হচ্ছে আমি বাড়ি ফিরতে পারব না। কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরব। কোনও মতেই বাংলাকে ভাগ হতে দেব না।” সপ্তাহখানেক আগে ফোনে বিজয়ার প্রণাম জানিয়ে বাবাকে এমন সংকল্পের কথা বলেছিলেন নিহত সাব ইনস্পেক্টর অমিতাভ মালিক।






কাজ শেষ হয়েছে কিনা তা বলবে পুলিশ ও প্রশাসন। বলবেন সহযোদ্ধারা, যাঁরা শুক্রবার ভোরে সিকিম সীমান্তের শিরুবাড়িতে তাঁর পাশে থেকে গুরুংয়ের গুন্ডাবাহিনীর সঙ্গে গুলিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে বলা কথার সূত্র ধরে এবার বাড়ি ফিরছেন অমিতাভ। তবে কফিনবন্দি হয়ে। এদিন সকালে দাজির্লিং সদর থানা থেকে হুমাইপুরের শরৎ কাননের বাড়িতে ফোন আসে। ফোন ধরেন অমিতাভর বাবা সৌমেন মালিক। ফোনটা পেয়েই অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠেছিল। থানা থেকে সৌমেনবাবুকে কিছুই জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছিল, ‘প্লিজ, ছোট ছেলেকে ফোনটি দিন’। দুর্ঘটনার আঁচ পেয়ে গিয়েছিলেন সৌমেনবাবু। ছোট ছেলে অরুণাভকে মোবাইলটি দেওয়ার পরেই টিভি চ্যানেল অন করে দেন। ততক্ষণে পর্দায় ভেসে উঠেছে সেই ভয়ংকর দুঃসংবাদ। ‘গুরুংপন্থীদের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে মৃত এসআই অমিতাভ মালিক’। প্রিয় শানু আর নেই। কান্নার রোল ওঠে মালিক পরিবারে। শোকে পাথর হয়ে যান বাবা-মা। কান্নায় ভেঙে পড়েন ভাই অরুণাভ।



প্রতিবেশীরাও ছুটে আসেন। অমিতাভকে পাড়া-প্রতিবেশীরা প্রাণ দিয়ে ভালবাসত। এই সোমবারই বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাঁর। বাড়ির সবাই ভেবেছিলেন, কালীপুজোটা শানুর সঙ্গেই কাটবে। কিন্তু তার আগেই দুঃসবাদটি বিস্ফোরণের মতো কাঁপিয়ে দিল গোটা শরৎ কাননকে। ২০১৪ সালে পুলিশের চাকরি। তার কয়েকদিন পর ব্যাঙ্কেও চাকরি পান অমিতাভ। পরিবারের লোকজন ব্যাঙ্কের চাকরির পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। চাপও ছিল। কিন্তু হৃদয়ের ডাকে অমিতাভ পুলিশের চাকরিকেই বেছে নেন। বন্ধুরা জানালেন, আসলে দেশকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ ছোটবেলা থেকেই তাড়িয়ে বেড়াত অমিতাভকে। অ্যাডভেঞ্চার ভালবাসতেন। তাই পাহাড়ি অঞ্চলে কাঁধে এসে পড়া নতুন দায়িত্ব প্রাণপণে পালনের চেষ্টা করছিলেন। এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) অনুজ শর্মা জানিয়েছেন, “অমিতাভ পুলিশবাহিনীর গর্ব। ওর মৃত্যু বড় ক্ষতি। রাজ্য পুলিশ ও রাজ্য সরকার অমিতাভর পরিবারের পাশে থাকবে।”



এর আগেও দার্জিলিংয়ের পাতলেবাসের অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন অমিতাভ। তখনও দিনরাত নিউজ চ্যানেলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন বাড়ির লোকজন। আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন, ‘ছেলেকে ভাল রেখো। ঠিক রেখো’। এদিন আর প্রার্থনার সুযোগ পায়নি মালিক পরিবার। গুরুংপন্থীদের থেকে আসা ঝাঁকে ঝাঁকে গুলিকে তোয়াক্কা না করে যখন অপারেশন সারছিলেন সাতাশের অকুতোভয় অমিতাভ ওই সময় কয়েকটি বুলেট তাঁকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মধ্যমগ্রামের আদরের শানু।



খুব কষ্ট করেই অমিতাভর বড় হয়ে ওঠা। বরাবরের মেধাবী। ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করার পর আইআইটি-তে এমটেক করার সুযোগ পেয়ে যান অমিতাভ। কিন্তু অর্থাভাবে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। বরং পরিবারের হাল ধরতে চাকরির পরীক্ষায় বসতে শুরু করেন অমিতাভ। বাবার বেসরকারি সংস্থায় সামান্য মাইনের চাকরি। ভাই পড়ে ক্লাস টুয়েলভে। টেনেটুনে সংসার চলত। অমিতাভর চাকরি পাওয়ার পর মালিক পরিবারের অবস্থা বদলাতে থাকে। একচালা বাড়িতে কংক্রিটের ছাদ হয়। এ বছরের মার্চে বিয়েও সেরে ফেলেন অমিতাভ। স্ত্রী বিউটি দত্ত মালিক অমিতাভর সঙ্গে দার্জিলিংয়েই থাকতেন। আগস্টে বিউটি অসুস্থ হওয়ার পর একবার বউকে নিয়ে মধ্যমগ্রামে ফিরেছিলেন অমিতাভ। তারপর আবার বিউটিকে নিয়ে দার্জিলিং ফেরেন। মাত্র ছয় মাসের সেই যাত্রাতেও ইতি পড়ল অমিতাভর আকস্মিক চলে যাওয়ায়। নিহত অমিতাভের বাবা ও স্ত্রীকে চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার।






You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!